ঘুরে আসুন কিশোরগঞ্জের ইটনা হাওর

0
120

সর্বশেষ আপডেট 7 months আগে | নিউজ ভিশন ২৪

ভ্রমন ডেস্ক: হাওর, নদী-নালা, খাল-বিল আর মৎস্য সম্পদের অন্যতম জেলা কিশোরগঞ্জ। অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, নিকলী ও বাজিতপুর উপজেলা নিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার মূল হাওরাঞ্চল। এই জেলার হাওর উপজেলাগুলোর মধ্যে ইটনা অন্যতম। সারা বছরই ইটনার হাওর গুলোতে কম-বেশি পানি থাকে। তবে বর্ষাকালে যেন হাওর পায় তার পূর্ণ যৌবন।

যেন সাদা ক্যানভাসে শিল্পীর তুলিতে আকা স্বপ্নলোকের ছবি। বর্ষায় দুচোখে শুধু দিগন্তজোড়া অথৈ পানির বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। আবার কোথাও কোথাও মাথা চারা দিয়ে উঠে একটি দুটি সবুজ বৃক্ষ, দ্বীপের মত ভাসমান একটি দুটি কিংবা একগুচ্ছ বসতবাড়ি। বর্ষায় ইটনা হাওরের মানুষের চলাচলের একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। তবে সম্প্রতি হাওরের বুকে গড়ে উঠেছে দৃষ্টি নন্দন সড়ক। সরীসৃপের মতো গভীর হাওরের বুকের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে এই নবনির্মিত সড়ক।

ইটনা হাওরে নৌকায় ভাসতে ভাসতে দেখতে পাবেন জেলেদের মাছ ধরা, ঝাঁকে ঝাঁকে পানকৌড়ির এখান থেকে ওখানে ছুটে চলার দৃশ্য। এছাড়াও চোখে পড়বে নানা প্রজাতির পাখি। আর হাওরের বুকে সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য বর্ষায় যেন সমুদ্র সৈকতকেও হার মানায়। ইটনায় দুইটি উল্লেখযোগ্য হাওর অবস্থিত। শনির হাওর ও ধনপুরের হাওর।

ইটনা হাওর ভ্রমণে কি দেখবেন: ইটনা সদরে অবস্থিত ‘ইটনা শাহী মসজিদ‘ উপজেলার সমস্ত দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্থানীয়দের মধ্যে এই মসজিদের নাম নিয়ে দ্বৈত মত দেখা যায়। কেউ কেউ এটাকে বলেন গায়েবী মসজিদ, আবার অনেকে বলেন তিন গম্বুজ মসজিদ।
মোগল স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত ইটনা শাহী মসজিদটি একটি বেদির উপর স্থাপিত। চারপাশে মোটা দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত মসজিদের দুইটি তোরণ এবং ছাদে তিনটি সুদৃশ্য গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের মূল কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় ভাবে এটি বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। কিছুটা অপরিকল্পিত ভাবে মেরামত করায় মসজিদের গায়ে থাকা শিলালিপি সিমেন্টের প্রলেপের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৪২৫ বছর পুরনো এই ইটনা শাহী মসজিদটি বারো ভূইয়ার প্রধান ঈসা খাঁর সভাসদ মজলিশ দেলোয়ার নির্মাণ করেন।

ইটনার শাহী মসজিদ

এছাড়া আরো আছে ধনপুর ইউনিয়নের কাঠইর গ্রামে রয়েছে ইটনার সূর্য্যসন্তান জমিদার গুরুদয়াল সরকারের বাড়ি। কিশোরগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুদয়াল সরকারী কলেজ তার জমিতেই প্রতিষ্ঠিত। ইটনার জয়সিদ্ধিতে রয়েছে আনন্দ মোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ মোহন বসুর বাড়ি। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে আনন্দ মোহন বসুর মামা হতেন।

কিভাবে যাবেন ইটনা হাওরে : সরাসরি যদি ইটনা হাওরে যেতে চান তবে প্রথমে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে আসতে হবে। ঢাকা থেকে ট্রেনে কিংবা বাসে চড়ে কিশোরগঞ্জ আসতে পারবেন।

ঢাকা হতে ট্রেনে কিশোরগঞ্জ : কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশান থেকে সকাল ৭ টা ১৫ মিনিটে এগারোসিন্ধুর ট্রেনে উঠলে দুপুর ১১ টার মধ্যে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাতে পারবেন। ট্রেনের টিকেট কাটতে শ্রেনী ভেদে ১২৫ টাকা থেকে ২০০ টাকা লাগবে। এরপর ইজিবাইক (অটো) দিয়ে মাত্র ৫ টাকা ভাড়ায় কিংবা ৫ মিনিট পায়ে হেঁটে আসতে হবে শহরের একরামপুর মোড়ে।

ঢাকা থেকে বাসে কিশোরগঞ্জ : মহাখালী বাস স্ট্যান্ড থেকে কিশোরগঞ্জ গামী “অনন্যা পরিবহন” বা গোলাপবাগ বাস স্ট্যান্ড থেকে কিশোরগঞ্জগামী অনন্যা সুপার কিংবা যাতায়াত বাসে কিশোরগঞ্জের শহরস্থ গাইটাল বাসস্ট্যান্ড চলে আসুন। জনপ্রতি বাস ভাড়া ২০০-২২০ টাকা। মহাখালী থেকে সময় লাগবে ৩ ঘন্টার মত এবং গোলাপবাগ থেকে ৪ ঘন্টার মত। আর গোলাপবাগ থেকে হাওর বিলাস কিংবা উজান ভাটি বাসে আসেন তবে সরাসরি চামটা বন্দর/ চামটা ঘাটে নামতে পারবেন। এক্ষেত্রে কিশোরগঞ্জ শহর থেকে অন্য পরিবহণে আপনাকে চামটা বন্দর আসতে হবে না। তবে কিশোরগঞ্জের কোন বাস সার্ভিসই তেমন ভালনা। তার মধ্যে তুলনামূলক ভাল সার্ভিস ভাল মহাখালীর অনন্যা পরিবহন এবং গোলাপবাগ থেকে যাতায়াত বাস সার্ভিস।

যদি অনন্যা সুপার কিংবা যাতায়াত বাসে কিশোরগঞ্জের গাইটাল বাসস্ট্যান্ড এসে নামেন তবে সেখান থেকে ইজিবাইক দিয়ে শহরের একরামপুর মোড়ে চলে আসুন। ইজিবাইকে ১৫ টাকা এবং রিক্সায় ৩০ টাকা ভাড়া লাগবে।

কিশোরগঞ্জ থেকে ইটনা : একরামপুর মোড় হতে সিএনজি কিংবা মাহেন্দ্রতে চড়ে জনপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা ভাড়ায় চামটা ঘাট আসতে হবে। একরামপুর থেকে চামটা ঘাটের দূরত্ব বিশ কিলোমিটার। চামটাঘাট থেকে ইটনা যাবার জন্য ট্রলারে পাওয়া যায়। চামটা ঘাট হতে প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে শুরু করে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত নিয়মিত বিরতিতে ইটনার উদ্দেশ্যে ট্রলার ছেড়ে যায়। একইভাবে ইটনা থেকেও প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে শুরু করে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত ট্রলার চলাচল করে। ট্রলারে করে ইটনা যেতে ৬০ টাকা ভাড়া লাগে, আর সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টা। বলে রাখা ভাল কিশোরগঞ্জের স্থানীয় মানুষ চামটা ঘাট-কে আঞ্চলিক ভাবে ‘চামড়া ঘাট’ নামে ডাকে।

চামটাঘাট থেকে সারাদিনের জন্য ইঞ্জিন নৌকা বা ট্রলার রিজার্ভ নিলে সবগুলো জায়গা একদিনে ভ্রমণ করতে করে সেই দিনই কিশোরগঞ্জ শহরে ফিরে আসতে পারবেন। এক্ষেত্রে ট্রলারের সাইজ অনুযায়ী ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকা ভাড়া লাগবে।

কোথায় থাকবেন: পর্যটকদের জন্য ইটনায় বলার মত তেমন ভাল আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। কিছু সাধারণ মানের রেস্ট হাউজ রয়েছে। ইটনা জেটি থেকে ডান দিকে ঠাকুর গেস্ট হাউসে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায় থাকার জন্য রুম পেয়ে যাবেন। তবে উপজেলা পরিষদের ডাক বাংলোতেও চাইলে থাকতে পারবেন। এছাড়া ভাল মানের হোটেলে রাত্রি যাপনের জন্য আপনাকে কিশোরগঞ্জ জেলায় ফিরে আসতে হবে। কিশোরগঞ্জ শহরে বিভিন্ন মানের বেশকিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এদের মধ্যে গাংচিল, ক্যাসেল সালাম, রিভারভিউ, উজান ভাটি উল্লেখযোগ্য।

কোথায় খাবেন: ইটনা বাজারে খাবারের জন্য বেশকিছু হোটেল পাবেন। হাওরের তাজা মাছের বিভিন্ন পদ দিয়ে বেশ ভালোমতই উদরপূর্তি করে নিতে পারবেন। এছাড়া মিষ্টি প্রিয় হলে কিশোরগঞ্জ শহরের লক্ষী নারায়ন, মদনগোপাল বা রাজমনী সুইটসের মালাইকারী, টেস্ট করবেন।

সতকর্তা: হাওর ভ্রমণে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করুন। যারা সাতার জানেন না তাদের হাওর ভ্রমণে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে আসবেন। লাইফ জ্যাকেট, বয়া ও বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম সাথে রাখুন। অনেকেই সমুদ্রের মতো হাওরের পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করতে পছন্দ করেন। তবে মনে রাখবেন হাওরের সব জায়গা কিন্তু জমি নয়। কিছু কিছু জায়গায় মৎস আহরণের জন্য ছোট বড় গর্ত করে ফাঁদ পাতা হয়। এসব ফাঁদ পানির নিচে থাকায় বুঝা যায় না। তাই পানিতে নামার আগে স্তানীয়দের সহায়তা নিতে পারেন। এছাড়া বিব্রতকর কোনো পরিস্থিতিতে পড়লে নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের সুবিধার্থে ইটনা থানার দুটি ফোন নম্বর দেয়া হলো। অফিসার ইনচার্জ: ০১৩২০-০৯৫৬২৫ ও ডিউটি অফিসার: ০১৩২০-০৯৫৬৩০। আর অবশ্যই হাওর ভ্রমণে আপনার ব্যবহার্য পলিথিন, বোতল ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

 

মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন